কোলকাতা – বেনারস ঘুরে আসুন মাত্র ২০০০ টাকায়, বিস্তারিত

বারানসী, বেনারস যে যাই বলুন, বাঙালির দ্বিতীয় ঠিকানা; মনে আছে ফেলু মিত্তিরকে? জয় বাবা ফেলুনাথ!!; এই বেনারসের গঙ্গার ঘাটের প্রতি আমার প্রথম আকর্ষণ তৈরি হয় ফেলুদার নজর মেপে; এই গঙ্গার ঘাটে দাঁড়িয়ে তাকালেই মনে হয় যেন ফেলুদা তার শক্ত চোয়াল আর পুরুষালী বাচনভঙ্গিতে বলছেন- “হয় আমি এর বদলা নেব, নইলে গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেবো”

মার্ক টোয়েন বলেছিলেন; “Banaras is older than history, older than tradition, older even than legend and looks twice as old as of them put together.”

বেনারসে কোথায় কিভাবে ঘুরবেন? সস্তার ট্যুর প্লান পেতে এই ভিডিওটি দেখুনঃ
দেখুন ভিডিওটি

ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর সারদামনি এখানেই এসেছিলেন তীর্থ করতে; পথের পাঁচালীর হরিহরের মৃত্যু? এই কাশীতে… চোখেরবালির বিনোদিনী – তাঁর সাথেও বারানসী আছে।
হাজার বছর ধরে এই শহর লক্ষ কোটি ইতিহাসের সাক্ষী; মহাভারত থেকে জাতক, তুলসিদাস থেকে সন্ত কবীর, শঙ্করাচার্য বা ইন্দোরের অহল্যাবাই এই শহরে -কে আপন-কে পরদেশী? তার কোন ইয়ত্তা নেই।
এ শহর প্রাচীন, এ শহর আধুনিক, progressive and sometimes regressive, all at once.

কাশীর রাজা দিবোদাস নাস্তিক বৌদ্ধদের ভক্ত হলে শিব বিরক্ত হয়ে এই শহর ছেড়ে কৈলাসে চলে গিয়েছিলেন। দেবতারা কোনও দিনই পরমতসহিষ্ণু নন। কিন্তু দেবতাদেরও পরিবর্তন হয়। শঙ্করাচার্য কাশীতে গঙ্গাস্নানে যাচ্ছেন। আচমকা তাঁর পিছনে চারটি কুকুর নিয়ে এক চণ্ডাল। শংকর ‘দূর হঠো’ বলে চেঁচিয়ে উঠলেন।

অস্পৃশ্য চণ্ডাল সামনে এসে বলল, “কোথায় যাব? আপনি কি দেহটাকে সরে যেতে বলছেন? না আত্মাকে? আত্মা তো অদ্বৈত। কোথায় সরে যেতে বলছেন প্রভু? এক অন্নময় দেহ থেকে আর এক অন্নময় দেহে? নাকি এক চৈতন্য থেকে অন্য চৈতন্যে?” শংকর বুঝলেন, ইনিই স্বয়ং শিব। চণ্ডালের বেশে কাশীর গঙ্গাতীরে তাঁকে অদ্বৈততত্ত্ব বোঝাতে এসেছেন। কাশীশ্বরের মতিগতি বোঝা ভার। কখন বৌদ্ধদের প্রতি রেগে যাবেন, আবার কখন নিজেই অস্পৃশ্যবেশে দেখা দেবেন, কেউ জানে না।”

হাজারটা ভালোর মধ্যে এক মন্দ এখানে, তীর্থের পান্ডা; যেখানে-

শিব ঠাকুরের আপন দেশে,
আইন কানুন সর্বনেশে !
কেউ যদি যায় পিছ্‌লে প’ড়ে
প্যায়দা এসে পাক্‌ড়ে ধরে,
কাজির কাছে হয় বিচার—
একুশ টাকা দণ্ড তার ৷৷

-একুশে আইন

সুকুমার রায়ের একুশে আইনের প্রতিচ্ছবি যেন; এরাই সত্যজিত রায়ের অমর সৃষ্টি মগনলাল মেঘরাজের মত তীর্থের ভিলেন; এড়িয়ে চলুন।
বেনারস মানে মন্দির-মসজিদ, সর্বধর্ম একতা; গঙ্গা; ঘাট; ইতিহাস! ৮৪ টি ঘাট আছে সর্বোমোট।

বরুণা ও অসির মধ্যবর্তী বারাণসী নগর উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত। গঙ্গা এখানে উত্তরবাহিনী এবং অর্ধচন্দ্রাকৃতি। একেবারে উত্তরে বরণা ও গঙ্গার সঙ্গমে বরণাসঙ্গম ঘাট দিয়ে শুরু করা যাক ঘাট-দর্শন। বরণা এখন ক্ষীণকায়া নদী। কয়েকটি মন্দির আর বেনারসের এক মন্ত্রী লাল খানের সমাধি ছাড়া তেমন দর্শনীয় কিছু নেই। কিন্তু কাশী ও বরণা নদী অমর হয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের সামান্য ক্ষতি কবিতায়। বরণাসঙ্গমে এলে যে কোনও কাব্যরসিক বাঙালিরই মনে পড়বে—

“বহে মাঘ মাসে শীতের বাতাসে,
স্বচ্ছসলিলা বরুণা।
পুরী হতে দূরে গ্রামে নির্জনে
শিলাময় ঘাট চম্পকবনে,
স্নানে চলেছেন শতসখীসনে
কাশীর মহিষী করুণা।”

এর পরের উল্লেখযোগ্য ঘাট হল পঞ্চগঙ্গা ঘাট। মাঝে অবশ্য পেরিয়ে আসতে হয়েছে রাজা ঘাট, প্রহ্লাদ ঘাট, ত্রিলোচন ঘাট, গাই ঘাটের মতো কয়েকটি ঘাটকে। পঞ্চগঙ্গা ঘাট তৈরি করেন অম্বরের রাজা মানসিংহ। লোকবিশ্বাস, একদা নাকি এখান দিয়ে গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, কিরণা ও ধূতপাপা নামের পাঁচটা নদী প্রবাহিত হত। বর্তমানে শুধু গঙ্গা রয়েছে, বাকীগুলো অন্তঃসলিলা। এই ঘাট কাশীর পঞ্চতীর্থের অন্যতম। প্রাচীন বিধান হল, কাশীর পুণ্যার্থীদের একই দিনে পর পর অসি ঘাট, দশাশ্বমেধ ঘাট, বরণা-সঙ্গম ঘাট, পঞ্চগঙ্গা ঘাট এবং সব শেষে মণিকর্নিকা ঘাটে স্নান করতে হবে, তবেই কাশীক্ষেত্রের পুণ্য লাভ হবে।

হাজার হাজার মন্দির মন্দিরের শহর কাশী…তবে প্রধান আকর্ষণ কাশী বিশ্বনাথ মন্দির; এই মন্দির কবে থেকে আছে তা কেউ জানেন না; হিন্দুদের বিশ্বাস খোদ ভগবান শিব এই মন্দিরে কিছুকাল অবস্থান করেছিলেন; বারোটি জোতির্লিঙ্গের মধ্যে এই মন্দির অন্যতম; এখানেই ভগবান শিব “বিশ্বনাথ বা বিশ্বেশ্বর” নামে পুজিত হন।”

বার বার বহির্শত্রুর আক্রমণে ধবংস হয়েছে এই মন্দির; মোহম্মদ ঘুরীর ভারত আক্রমণের সময় যখন হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম স্থাপত্য ধ্বংস শুরু হয় তখন এই মন্দির ধবংস করা হয়; পরে ১৪৯০ সালে এই মন্দির খুঁজে পাওয়া যায়; এবং আকবরের নির্দেশে সেটি সংস্কার করা হলেও; অত্যাচারী মুঘল শাসক আওরঙ্গজেব সেটি আবার আক্রমণ করে ভেঙে জ্ঞানভাপী মসজিদে রূপান্তরিত করেন। সেই মসজিদের কিছু অংশ এখনও এখানেই রয়েছে। বার বার ধংস করার পরও এই মন্দির আজও ইতিহাসে মাথা উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে; ১৭৮০ সালে ইন্দোরের মহারাণী অহল্যাবাই এই মন্দির পূনঃনির্মাণ করেন এবং ১৮৩৫ সালে পাঞ্জাবের সম্রাট রঞ্জিত সিং ১০০০ কেজি সোনা দিয়ে এই মন্দিরের ছাদ নির্মাণ করেন…

হাজার হাজার ছোটো বড়ো মন্দির স্থাপত্য দেখে আর ঘাটে বসে গঙ্গা; সময় এখানে বড্ড দ্রুত পায়ে চলে;
সময় করে কাছেই ঘুরে আসতে পারেন বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম পীঠস্থান সারনাথ। সর্বধর্মের আঁতুড় ঘর এই বেনারস, বাঙালির দ্বিতীয় আস্তানা।

Leave a Comment